টুলকিট

ভয়ঙ্কর গ্লাইফসেট : মৌমাছি ও গ্লাইফসেট

ভয়ঙ্কর গ্লাইফসেট : মৌমাছি ও গ্লাইফসেট

আগাছানাশক হিসেবে গ্লাইফসেটের (বদ)নাম মোটামুটি দুনিয়াজোড়া। আমরা সবুজ পৃথিবীর থেকে টুলবক্স বলে একটা বিভাগ করেছি আমাদের ওয়েবসাইটে, যেখানে আমরা পরিবেশকর্মীদের নানান ফ্রিতে ব্যবহার করা যায় এরকম খবর দিয়ে থাকি। সেখানে আমরা এবার গ্লাইফসেট নিয়ে একটা পর্ব লিখব, যেখানে একেবারে হাতে গরম বৈজ্ঞানিক গবেষণার ফলাফল যা গ্লাইফসেটের ক্ষতিকারক দিক গুলো তুলে ধরেছে সেটাকে তুলে ধরবে।

প্রসিডীংস অফ ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অফ সাইয়েন্স এর একটা সাম্প্রতিক গবেষণায় প্রকাশ, গ্লাইফসেট, মৌমাছির পেটের ভেতরের ব্যাকটেরিয়াদের মেরে ফেলে। মৌমাছির পেটের ভেতরের এই বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়ার একটা মিথোজীবী সম্পর্কে থাকে এবং এরা মৌমাছির শরীর স্বাস্থ্য ভালো রাখতে ও বাইরের ক্ষতিকারক অণুজীবের হাট থেকে মৌমাছিকে রক্ষা করে। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন গ্লাইফসেট মৌমাছির পেটের ভেতরের এই ব্যক্টেরিয়া গুলির সংখ্যা কমিয়ে দেয়। এবং তার ফলে মৌমাছিরা সাধারণত যে সব অণুজীব দ্বারা আক্রান্ত হয় না, সেই রকম অণুজীব গুলিও এই অপেক্ষাকৃত দুর্বল হয়ে যাওয়া মৌমাছিদের মেরে ফেলে। দেখা গেছে, মৌমাছির কলোনির সংখ্যা এবং এবং তাদের পরাগ মিলন করার ক্ষমতা দুই ই কমে যায়। 

আরেকদল বিজ্ঞানী কিছু এপিস মেলিফেরা মৌমাছি ধরে তাদের একটি নির্দিষ্ট জায়গা থেকে মিষ্টি জল খাওয়ার ট্রেনিং দিলেন। কিছু বার এরকম করার পর, কিছু মৌমাছি গুলোকে ধরে খুব অল্প পরিমান গ্লাইফসেট খাইয়ে দিলেন এবং তাদের বাড়ি ফেরার গতিপথ ট্র্যাক করলেন। তারা দেখলেন গ্লাইফসেট খাওয়ানোর পর মৌমাছিরা বাড়ি ফিরতে অনেক অনেকটা সময় নিচ্ছে। বিজ্ঞানীরা আরও বললেন যে গ্লাইফসেট স্প্রে করলে মৌমাছিদের বোধশক্তি হারিয়ে যায় এবং এর ফলে পরাগমিলন সহ মৌমাছিদের বেঁচে থাকা সবই বিপদে পড়ে।

মৌমাছি এবং কেঁচো গ্লাইফসেট

২০২১ সালে সায়েন্স অফ দি টোটাল এনভায়রনমেন্ট জার্নালে একটি বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ বেরোয় যেখানে বিজ্ঞানীরা একটি সোজা সাপটা প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেন। প্রশ্নটি হল গ্লাইফসেট কি মৌমাছিদের জন্যে বিষ? এই জন্যে তারা খুঁজে বার করেন মৌমাছিদের ওপর গ্লাইফসেট প্রয়োগ করে কটি পরীক্ষা ইতিপূর্বে হয়েছে। সেখান থেকে তারা দেখেন যে আগে ৩৪ টি এরকম পরীক্ষা হয়েছে। এবার এই পরীক্ষা গুলি বিভিন্ন রকমের, কোনটায় সরাসরি গ্লাইফসেট খাওয়ানো হয়েছে, কোনটায় স্প্রে করা হয়েছে, মৌমাছির সংখ্যা এবং প্রজাতিও বিভিন্ন পরিক্ষায় বিভিন্ন, কোনটায় লার্ভা অবস্থায় পরীক্ষা করা হয়েছে আবার কোনটায় বড় মৌমাছির ওপর পরীক্ষা হয়েছে। মানে মোদ্দা কথা প্রতিটি স্টাডি বা বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান বিভিন্ন রকমের কিন্তু সবার লক্ষ্য ছিল একই – যে কি ভাবে মৌমাছির জন্যে গ্লাইফসেট বিষ কিনা সেটা দেখা। এই সব ৩৪ টি পরীক্ষার থেকে প্রাপ্ত তথ্যকে একটি গাণিতিক মডেলের সাহায্যে একটি সিদ্ধান্তে আসা যায়, একে মেটা এনালাইসিস বলে। সেই মেটা এনালাইসিস করে বিজ্ঞানীরা বলছেন , হ্যাঁ গ্লাইফসেট মৌমাছির জন্যে বিষ। বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধের লিঙ্ক নীচে কমেন্টে দেওয়া হল

গ্লাইফসেট ছাড়ে না কেঁচোকেও। বড় বড় টবে গাছপালা লাগিয়ে বিজ্ঞানীরা গ্লাইফসেট দেওয়ার আগে এবং পড়ে কেঁচোর ব্যবহার লক্ষ্য করেছেন। তারা দেখেছেন যে কেঁচো মাটির ওপর নিচ করে মাটির মান উন্নত করে, তারা এই গ্লাইফসেট দেওয়ার ৩ সপ্তাহের মধ্যে কেঁচোর মাটির নিচ থেকে ওপরে উঠে আসার সময় যে মল ত্যাগ করে সেটা একেবারে বন্ধ হয়ে যায়। এই মল বা সারফেস কাস্ট জমির উর্বরতা বাড়ায় যা গ্লাইফসেট প্রয়োগে একেবারে বন্ধ হয়ে যায়। এর সাথে সাথে কেঁচোর বংশ বৃদ্ধি কমে যায় প্রায় ৫৬ শতাংশ।

বন্ধু ছত্রাক শেষ

মাটির বন্ধু অণুজীবের মধ্যে বেশ কিছু ছত্রাক অন্যতম। মাটির রক্ষণাবেক্ষণ থেকে শুরু করে উর্বরতা নানাবিধ বিষয়ে ছত্রাক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। পূর্বে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন যে গ্লাইফসেটের প্রয়োগে বেশ কিছু ছত্রাকের প্রজাতির সর্বনাশ হয়, আর কিছু প্রজাতির হয় পৌষমাস। যাদের বাড়বাড়ন্ত হয় তাদের মধ্যে আবার অনেকেই শস্যের ক্ষতিকারক ছত্রাক। যাই হোক ব্যাপার হল এই ধরনের পরীক্ষা একেবারে মাঠে করতে পারলে সেরা। এবং যত বেশি দিন ধরে করা যাবে ততই ভালো। নইলে অনেকেই প্রশ্ন তুলতে পারেন।

২০২১ সালে আর্জেন্টিনার তিন বৈজ্ঞানিক দুই বছর ধরে পরীক্ষা চালান গ্লাইফসেটের প্রভাব কি ছত্রাকের ওপর সেই নিয়ে। তারা একাধিক চাষের প্লটে একেবারে বাণিজ্যিক গ্লাইফসেট দেওয়ার যে মাত্রা, সেই মাত্রা ধরে গ্লাইফসেট দেন, কিছু প্লটে বাণিজ্যিক মাত্রার দ্বিগুণ পরিমান গ্লাইফসেট দেন, এবং কিছু প্লটে স্রেফ জল দেন। এই বার প্রতি সপ্তাহে সব কটি প্লট থেকে মাটি তুলে নানাবিধ পরীক্ষার মাধ্যমে সেখানের ছত্রাকের সংখ্যা বা কোন ধরনের ছত্রাক আছে সেটা মাপা হয় দুবছর ধরে।

পরীক্ষার ফলাফলে দেখা গেলো যে গ্লাইফসেট দেওয়া প্লটগুলি তে ছত্রাকের ধরন এবং সংখ্যা পুরোপুরি এই আগাছানাসকের ওপর নির্ভরশীল, কিন্তু শুধু জল দেওয়া প্লটে বিভিন্ন ঋতুতে, তাপমাত্রা, আদ্রতা বা বৃষ্টির ওপর নির্ভর করে ছত্রাকের সংখ্যা এবং ধরন পাল্টাচ্ছে। অর্থাৎ গ্লাইফসেট প্রাকৃতিক ছত্রাকের বাড়া কমা কে পাল্টাচ্ছে। গ্লাইফসেট প্রয়োগে স্পিসিস রিচনেস বা বন্ধু ছত্রাকের বৈচিত্র্য কমে যাচ্ছে। বিজ্ঞানীরা অনুমান করেছেন, দীর্ঘ কালীন গ্লাইফসেট প্রয়োগে অবশ্যই ছত্রাকের মিউটেসান সৃষ্টি করবে এবং মাটির ছত্রাকের ওপর স্ট্রেস বা চাপ ফেলছে।

মনস্যান্টোর জালিয়াতি, পেস্টিসাইড, এবং কান্সার 

পেস্টিসাইড এবং ক্যান্সারের যে সরাসরি সম্পর্ক আছে তা বলাই বাহুল্য। বাংলাদেশে চাষিদের মধ্যে সব থেকে বেশি ক্যান্সার হওয়ার ঘটনা, বা ভারতে পাঞ্জাব হরিয়ানাতে চাষিদের মধ্যে বিপুল সংখ্যক কান্সার রোগী – এসবই সাম্প্রতিক অতীতের ঘটনা। এই বারে আমরা কথা বলব কুখ্যাত কোম্পানি মনস্যান্টো কি ভাবে জালিয়াতির মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক গবেষণার ফলাফল এদিক ওদিক করে।

পেন্সিল্ভ্যানিয়া এবং নিউ হ্যাম্পসায়ার ইউনিভার্সিটির গবেষণায় উঠে এসেছে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য। গবেষণায় প্রকাশ, মনস্যান্টো একটি প্রাইভেট ফার্মকে দিয়ে বৈজ্ঞানিক পেপার লেখাত যা পেস্টিসাইডের কুফল গুলিকে ঢেকে দিয়ে বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ প্রকাশ করত। মনস্যান্টো বৈজ্ঞানিক জার্নালের এডিটরের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করা, বা সঠিক বৈজ্ঞানিক গবেষণার ফলাফল প্রকাশ আটকে দেওয়ার মত নানাবিধ কাজ করেছে। একই সাথে তাদের লক্ষ্য ছিল সঠিক এবং নিরপেক্ষ বৈজ্ঞানিক গবেষণার ফলাফল চেপে দিয়ে ভবিষ্যতে সাধারন মানুষের বৈজ্ঞানিকদের প্রতি এবং বিজ্ঞানের প্রতি ধ্যান ধারনাকে ক্ষতিগ্রস্থ করা। 

গ্লাইফসেট যে শুধুমাত্র পরিবেশ এবং মানুষের জন্যে ক্ষতিকারক তাই নয়, এর প্রস্তুতকারক সংস্থাটিও সমান ক্ষতিকারক। এবং তারা ক্ষমতাবলে বৈজ্ঞানিক গবেষণার ক্ষতি করতে প্রস্তুত। প্রবন্ধটির লিঙ্ক কমেন্ট বক্সে।

Leave a Comment