প্রতিবেদন

মনোজ দাজুর গল্প ২: খাবারের গল্প

মনোজ দাজুর গল্প ২: খাবারের গল্প

বিকেলের মুখে মনোজ দাজু গেটটা খুলে ঢুকতেই দোতলার বারান্দা থেকে দেবকুমার বাবু চেঁচিয়ে উঠলেন, “কিরে মনোজ আগের সপ্তাহে এলি না কেন? আমি তো ভেবেই মরি। ভাবছিলাম তোর বাড়ির দিকে যাব!”

গ্রীষ্মের বিকেলের মেঘ এসে কাঞ্চনজঙ্ঘা ঢেকে দিয়েছে, ফুরফুরে হাওয়া দিচ্ছে। মনোজ দাজু দোতালার বারান্দা তে এসে হাওয়াই চপ্পল খুলে দেবকুমার বাবুর সামনের টুলে বসলো। “ও ছিরি, দুটো চা দিয়ে যা বাবা!” বলে উঠলেন দেবকুমার বাবু। মনোজ দাজু রোদে শুকোতে দেওয়া এক খন্ড তিতোরার টুকরো মুখে দিয়ে বললো “আরে গরম পড়ে গেল তো, একটু সবজি চাষ করছি এ বছর!”। দেব কুমার বাবু অবাক হলেন, মনোজের বাড়ি সোনাদা পেরিয়ে একটা পাহাড়ি বস্তির মধ্যে। সেখানে চাষবাসের বিশেষ জায়গা নেই, তাহলে মনোজ সবজি চাষ করছে বলছে!

দেব কুমার বাবু মুখ খোলার আগেই মনোজ দাজু বলল “আসলে স্যার, ছাদের উপর আর ব্যালকনি মিলিয়ে তো কম জায়গা ফাঁকা নেই, আর গেল বছর করোনার জন্য শাকসবজি তেমন আসেনি শিলিগুড়ি থেকে। রোজ রোজ রাই শাক আর স্কোয়াশ খেতে কত ভালো লাগে বলুন! তাই এবছর বউ-বাচ্চাকে নিয়ে নেমে পড়েছি, বাঁশ আর চট দিয়ে চৌকো চৌকো ফ্রেম মত বানিয়ে ওতেই মাটি পুরে সবজি লাগিয়ে দিচ্ছি।” মনোজের উৎসাহ দেখে খুশি হলেন দেব কুমার বাবু। আসলে দার্জিলিং শহরে শেষ ক’বছরে এত বাড়িঘর হয়েছে যে আশেপাশের গ্রাম গুলো থেকে সবজি এনে কুলোনো যায় না। সেই সমতলের উপরে ভরসা করতে হয়। আর করোনার পরে লকডাউনে যাতায়াত একেবারে বন্ধ হয়ে গেছিল। তখন তো আরও কিছু পাওয়া যায়নি।

“তা হ্যাঁরে, তুই কি হাভানার গল্প জানিস?” মনোজ মাথা নাড়তেই, দেব কুমার বাবু গরম ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বেশ জমিয়ে হাভানার গল্প বলতে শুরু করলেন। “সেটা নব্বইয়ের দশক, আমি তখনও সরকারি চাকরি করছি। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙ্গার পরে কিউবাতে আর তেল, ট্রাক্টর, সার, কীটনাশক কিছুই পৌঁছত না। এদিকে কিউবাতে আখের চাষ করে করে এমন অবস্থা হয়েছিল যে বেশিরভাগ জিনিসই বাইরে থেকে আনতে হতো। তার সাথে সাংঘাতিক জঙ্গল কাটা, জল দূষণ আর মাটির যাচ্ছেতাই খারাপ অবস্থা হয়ে গেছিল বুঝলি!” মনোজ বলল “আরে, এটা-তো আমাদের এখানেও তাই হচ্ছে”।

দেব কুমার বাবু মাথা নাড়লেন, “শুধু আমাদের এখানে নয় রে, যতগুলো শহর আছে বোধহয় সব শহরেই একই অবস্থা। তো যাই হোক কিউবান গভর্মেন্ট যখন দেখল যে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে পড়ার পরে চিনি কেনার মার্কেট চলে গেছে আর চাষের উপকরণ অন্য জায়গা থেকে আসছে না তখন তারা একটা নতুন ব্যবস্থা শুরু করলো। তারা বলল শহরে সবজি বাগান করো। শহরের মধ্যে কীটনাশক ব্যবহার করা বন্ধ করে দিল আর শহরের মাটিকে চাষের উপযোগী করার জন্য, শহরে বাড়ি বাড়ি আবর্জনা থেকে কম্পোস্ট সার বানানো শুরু হলও।”

মনোজ এতক্ষণ হাঁ করে শুনছিল, একটু দম নেওয়ার জন্য দেব কুমার বাবু থামতেই বলল ” স্যার আমিও বাড়ির সবজি মাছ মাংস কিছুই ফেলতে দিই না, ওই একটা ড্রাম আছে ওতে সব ঢুকিয়ে উপর থেকে একটু একটু করে কেমিক্যাল ছড়িয়ে দি। এক মাসে সব পচে মাটি হয়ে যায়।” দেব কুমার বাবু রেগে গিয়ে বললেন “ওরে গাধা, ওটা কেমিক্যাল নয়, ওটা অণুজীবের মিক্সচার। তুই যখন কলার খোসাটা বাড়িতে রেখে দিস কিছুদিন পরে কালো হয়ে যায় দেখিস নি। বাতাসে এরকম খুব ছোট ছোট ব্যাকটেরিয়া থাকে যারা এগুলোকে পচিয়ে দিতে পারে। তো যাই হোক সরকার আরও বললো যাদের বাড়িতে বাগান নেই তারা যেন কয়েকজন মিলে বাগান বানাতে পারে, তাতে সরকার সাহায্য করবে। কিন্তু শর্ত একটাই সেই বাগানে কোন রকমের কেমিক্যাল দেওয়া যাবে না, আর সেই বাগানের খাবার উদ্বৃত্ত হলে মার্কেটে বিক্রি করে দিতে হবে।

আজকের দিনে দাঁড়িয়ে হাভানাতে তিন লাখেরও বেশি বাড়ির পেছনের ফেলে রাখা জমিতে সবজি বাগান হয়েছে, সারা বছর ধরে ২৫ হাজার টন খাবার তৈরি হয়। কুড়ি লাখের ওপরে জনসংখ্যা হাভানাতে, ৪০ শতাংশ বাড়িতে আছে সবজির বাগান।” মনোজ দাজু, অবাক হয়ে শুনছিল বহুদূরের এক ছোট্ট দেশের শহরের কথা। আর মনে মনে ভাবছিল তাদের শহরে যদি দীনেশ, পূর্ণিমা, গুরুং ভাই সবাই মিলে এইটা করতে পারে তাহলে তো লকডাউন হলেও তারা সবজি পাবে। এই কথা বলতেই দেব কুমার বাবু বলে উঠলেন “সাবাস মনোজ, একদম ঠিক বলেছিস। পৃথিবীর সিংহভাগ লোক থাকে শহরে, আর তাদের খাবার আসে গ্রাম থেকে। এদের অনেকেই দামি সবজি কিনতে পারে না। এদের অনেকেই পুষ্টির দিক থেকে পিছিয়ে থাকে। ভাবতো যদি লকডাউন হয়, সমতলের দিকে বন্যা হয়, বা পাহাড়ে ধ্বস নামে, আমরা তখন কি করব? আবার যদি কোন ভাইরাস আসে, যদি আমরা আটকা পড়ে যাই। প্রত্যেকে যদি প্রত্যেকের খাবারের কিছুটা অংশ নিজে তৈরি করতে পারে তাহলে শহরে থেকেও স্বনির্ভর হওয়া সম্ভব।”

ইতিমধ্যে মেঘ বৃষ্টির খেলা শুরু হয়ে গেছে, আজ আর কাঞ্চনজঙ্ঘাতে রোদ পড়বে না। মনোজের যাওয়ার সময় হয়ে গেছে। হেঁটে হেঁটে ফিরতে হবে অনেকটা, কুড়ি টাকা গাড়ির ভাড়া বাঁচালে ওই টাকায় একটা ঝুমকো কিনে দেবে বউকে। উঠতে উঠতে মনোজ বলল “এই বছর থেকে রসুন, আদা, লঙ্কা, টমেটো আর রাই শাক কিনবো না স্যার। দেখি বস্তিতে যদি বাকিদের রাজি করাতে পারি। সবাই মিলে যদি শুরু করি তাহলে সবার বাচ্চাগুলোই একটু পুষ্টি পাবে, কি বলেন”। দেব কুমার বাবু আর কিছু বললেন না, তার বয়স হয়েছে, জোর কমেছে কিন্তু স্বপ্ন দেখতে আজও রাজি তিনি। মনোজ শুরু করেছে, এইভাবে যদি বাকিরাও শুরু করে তাহলে খাবার সমস্যা অনেকটা কমে যাবে। হেলতে দুলতে মনোজ গেটের দিকে এগুতে থাকলো আর ভাবতে থাকলো একমাস পরে রসুন পেঁয়াজ দিয়ে সরষে দিয়ে রাই শাকের ঝোলের কথা। তার থেকে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে কিউবার এক ব্যতিব্যস্ত শহরে অফিস যাওয়ার আগে আরেক জন হয়তো একই কথা ভেবে চলেছে।

 

আরো পড়ুন

মনোজ দাজুর গল্প ১ : কোভিড লকডাউনে কতটা থমকাল জলবায়ু পরিবর্তনের গতি?

 

 

Leave a Comment