প্রতিবেদন

IPCC ২০১৩: নীতিনির্ধারকদের জন্য সংক্ষিপ্তসার – পর্ব-২ | জলবায়ু পরিবর্তনের কারন

ভারতীয় জলবায়ু পরিরবর্তন সংক্রান্ত রিপোর্টের সংক্ষিপ্তসার পর্ব-২

প্রাকৃতিক বা মানুষের দ্বারা পরিচালিত কারন যা পৃথিবীর শক্তির তারতম্য ঘটায় সেটাই জলবায়ু পরিবর্তনের কারন। রেডিয়েটিভ ফোর্সিং এমন এক সূচক যা একক বর্গক্ষেত্রে শক্তির তারতম্য প্রকাশ করে। রেডিয়েটিভ ফোর্সিং শূন্যের থেকে বেশি (ধনাত্মক) হওয়ার মানে ভূপৃষ্ঠ গরম হচ্ছে; রেডিয়েটিভ ফোর্সিং শূন্যের থেকে কম হওয়ার মানে ভূপৃষ্ঠ ঠাণ্ডা হচ্ছে। বিজ্ঞানিরা ইন্ডাস্ট্রিয়াল রেভলিউসানের আগে এবং বর্তমান সময়ের রেডিয়েটিভ ফোর্সিং এর মান অঙ্ক কষে বের করেছেন। সামগ্রিক ভাবে রেডিয়েটিভ ফোর্সিং এর মান ধনাত্মক অর্থাৎ ইন্ডাস্ট্রিয়াল রেভলিউসানের তুলনায় বর্তমানে (২০১২ সালে) জলবায়ু-তন্ত্রে বা ক্লাইমেট সিস্টেমে শক্তি বৃদ্ধি ঘটেছে।  রেডিয়েটিভ ফোর্সিং এর ইন্ডাস্ট্রিয়াল রেভলিউসানের তুলনায় এই বৃদ্ধির প্রধানতম কারন পরিবেশে কার্বন ডাই অক্সাইডের বৃদ্ধি। 

মানুষের কর্মকাণ্ডের জন্য বা অ্যানথ্রোপোজেনিক কারনে রেডিয়েটিভ ফোর্সিং এর মান  ১৭৫০ সালের তুলনায় প্রতি মিটার স্কোয়ারে ২.২৯ (১.১৩ – ৩.৩৩) ওয়াট বৃদ্ধি পেয়েছে।

কার্বন ডাই অক্সাইড একক ভাবে প্রতি মিটার স্কোয়ারে ১.৬৮ (১.৩৩ – ২.০৩) ওয়াট; মিথেন ০.৯৭ (০.৭৪ – ১.২৪) ওয়াট এবং হ্যালোকার্বন গ্যাস গুলি সম্মিলিত ভাবে ০.১৮ (০.০১ – ০.৩৫) ওয়াট রেডিয়েটিভ ফোর্সিং এর বৃদ্ধি ঘটায়।

এরোসল বা বাতাসে ভাসমান ধুলিকনার মধ্যে কার্বন কনাগুলি সূর্যালোক শোষণ করে ভূপৃষ্ঠকে গরম করে এবং অন্যান্য অজৈব কনা গুলি মুলত সূর্যালোককে বিকিরিত করে ভূপৃষ্ঠকে ঠাণ্ডা করে। এরোসল আবার মেঘ সৃষ্টি করে যা সূর্যালোককে বিকিরিত করে ভূপৃষ্ঠকে ঠাণ্ডা করে। সম্মিলিত ভাবে এরোসল নেগেটিভ রেডিয়েটিভ ফোর্সিং করে অর্থাৎ ভূপৃষ্ঠকে ঠাণ্ডা করে।

জলবায়ু তন্ত্রের সাম্প্রতিক পরিবর্তন

জলবায়ুর এই পরিবর্তন একটি অত্যন্ত জটিল প্রক্রিয়া যার ফলাফলগুলি পরস্পর পরস্পরের সাথে জড়িয়ে থাকে। শুধু তাই নয় জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ঘটা অসংখ্য বিষয়গুলি একে অপরকে বিভিন্ন ভাবে প্রভাবিত করতে সক্ষম। সময়ের সাথে সাথে আমরা আরও শক্তিশালী কম্পিউটার, স্যাটেলাইট এবং উচ্ছ ক্ষমতা সম্পন্ন যন্ত্রপাতি আবিস্কার করেছি যা জলবায়ু পরিবর্তনের মত জটিল প্রক্রিয়াকে বুঝতে সাহায্য করছে। এবং প্রতি বছরের তুলনায়, সামনের বছর গুলিতে কোন সিদ্ধান্ত সম্পর্কে বিজ্ঞানিরা আরও নিশ্চিত হচ্ছেন।

জলবায়ু মডেলের মূল্যায়ন 

১৯৫১ থেকে ২০১২ অব্দি জলবায়ু মডেলের থেকে প্রাপ্ত তাপমাত্রার সাথে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের আবহাওয়া দপ্তরের থেকে নেওয়া তাপমাত্রা মিলিয়ে দেখা হয়েছে। মডেল এবং আবহাওয়া দপ্তরের ডেটা প্রায় একই রকমের যা থেকে এই সিদ্ধান্তে আসা যায় যে জলবায়ু মডেলটি সাফল্যের সাথে তাপমাত্রা গণনা করতে পারদর্শী এবং ভবিষ্যতের তাপমাত্রা কি হবে তা সম্পর্কে মডেলের আউটপুট ভীষণ ভরসাযোগ্য।

একই রকম ভাবে মডেলের থেকে পাওয়া অত্যন্ত গরম বা অত্যন্ত ঠাণ্ডা দিনের সংখ্যা এবং সেই দিনগুলির তাপমাত্রা আবহাওয়া দপ্তরের ডেটার সাথে সম্পূর্ণ ভাবে মিলে গেছে।

জলবায়ু মডেলের থেকে প্রাপ্ত অঞ্চলভিত্তিক বৃষ্টিপাত খুব নিখুত ভাবে আবহাওয়া দপ্তরের ডেটার সাথে মেলেনি। অবশ্য এর কারন হিসেবে বৃষ্টিপাত মাপার পদ্ধতির অনিশ্চয়তা খানিকটা দায়ী। যদিও মহাদেশীয় স্কেলে বৃষ্টিপাতের ক্ষেত্রে মডেল এবং আবহাওয়া দপ্তরের ডেটা প্রায় মিলে গেছে।

জলবায়ু মডেল এল নিনো, মনসুন, মেরু প্রদেশের বরফ গলার হার ইত্যাদি বিষয়ে সঠিক ভাবে মুল্যায়ন করলেও এরোসল বা বাতাসে ভাসমান ধুলিকনা এবং মেঘ ও তাদের সম্পর্কের দরুন হওয়া রেডিয়েটিভ ফোর্সিং সম্পর্কে অত্যন্ত অনিশ্চিত। যার ফলে বিজ্ঞানিরা ঠিক সঠিক ভাবে এরোসল এবং মেঘের দরুন তাপমাত্রা এবং রেডিয়েটিভ ফোর্সিং বাড়ছে না কমছে তা বলতে পারেন না।

জলবায়ু তন্ত্রের মধ্যকার প্রতিক্রিয়া (ফিডব্যাক)

জলবায়ু তন্ত্রের মধ্যে থাকা বিভিন্ন অংশগুলি চক্রাকার প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে বিশ্ব উষ্ণায়নকে দ্রুততর বা বিলম্বিত করে। এই চক্রাকার প্রতিক্রিয়া ধনাত্মক হলে উষ্ণায়ন বাড়ে এবং ঋণাত্মক হলে উষ্ণায়ন কমে।

জলীয় বাস্প জলবায়ু পরিবর্তনের একটি বৃহত্তর ধনাত্মক চক্রাকার প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। অর্থাৎ উষ্ণায়নের ফলে বেশি পরিমান জলীয় বাস্প বাতাসে মেশে যা আবার কিনা তাপ শোষণ করে উষ্ণায়নকে বাড়িয়ে তোলে।

একই রকম ভাবে মেঘও ধনাত্মক চক্রাকার প্রতিক্রিয়া দেয়। যদিও ডেটা কম থাকার কারনে মেঘ ক্ষেত্রে সামান্য অনিশ্চয়তা আছে।

কত দ্রুত এবং কোন পথে জলবায়ু পরিবর্তন হবে তা নির্ভর করে রেডিয়েটিভ ফোর্সিং, জলবায়ু তন্ত্র ছক্র (ফিডব্যাক) এবং জলবায়ু তন্ত্রের বিভিন্ন অংশের মধ্যে থাকা শক্তির পরিমানের ওপর।

জলবায়ু পরিবর্তনের বৈশিষ্ট

বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত ভাবেই মনে করেন ১৯৫১ – ২০১০ অব্দি হওয়া তাপমাত্রার বৃদ্ধি সম্পূর্ণভাবে মানুষের কর্মকাণ্ডের ফলে নির্গত গ্রিন-হাউস গ্যাস এবং অন্যান্য অ্যানথ্রোপোজেনিক কারনে হয়েছে।

গ্রিন-হাউস গ্যাসের জন্যে ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বেড়েছে ০.৫° – ১.৩°। অন্যান্য অ্যানথ্রোপোজেনিক কারনে (এরোসল, মেঘ-এরোসল সম্পর্ক ইত্যাদি) তাপমাত্রার পরিবর্তন হয়েছে -০.৬°-০.১° এবং প্রাকৃতিক কারনে এই পরিবর্তনের মান -০.১° – ০.১°। মিলিতভাবে ১৯৫১ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে ০.৬° – ০.৭° তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে।

স্বল্প নিশ্চিত ভাবে বলা যায় যে মানুষের প্রভাবের ফলে পৃথিবীর জলচক্রে পরিবর্তন এসেছে; বাতাসে জলীয় বাষ্প বেড়েছে, স্থলভাগে বৃষ্টিপাত বেড়েছে এবং ভারি বৃষ্টিপাতের সংখ্যা বেড়েছে।

১৯৮৬ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত স্যাটেলাইট ডেটার মাধ্যমে একেবারে নিশ্চিত ভাবে দেখা গেছে, সৌর-রশ্মির প্রাবল্যের বেশি কম হওয়ার সাথে তাপমাত্রা বৃদ্ধির কোন সম্পর্ক নেই।

তথ্যসুত্রঃ ipcc.ch

ছবিঃ asyousow.org

আরো পড়ুনঃ IPCC ২০১৩: নীতিনির্ধারকদের জন্য সংক্ষিপ্তসার – পর্ব-১ | জলবায়ু পরিবর্তনের অতীত এবং বর্তমান

IPCC ২০১৩: নীতিনির্ধারকদের জন্য সংক্ষিপ্তসার – পর্ব- ৩। ভবিষ্যতের জলবায়ু

Leave a Comment