বন্ধুদের লেখা

মধ্য প্রদেশের বক্সওয়াহা জঙ্গলে একটি প্রস্তাবিত হীরের খনির মূল্য: দুই লাখ গাছ ও অসখ্য প্রাণী-উদ্ভিদকূল ?

মধ্য প্রদেশের বক্সওয়াহা জঙ্গলে একটি প্রস্তাবিত হীরের খনির মূল্য: দুই লাখ গাছ ও অসখ্য প্রাণী-উদ্ভিদকূল

কলমেঃ দেবদীপ ঘোষাল

লেখক পরিচিতিঃ

দেবদীপ ঘোষাল ইউনিভার্সিটি অফ বাসেলসে নিউক্লিয়ার এবং পার্টিকেল ফিজিক্স বিষয়ে পোস্টডক্টরাল বৈজ্ঞানিক। গবেষণার বাইরে তিনি বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ লিখতে এবং পরিবেশ সচেতনতা নিয়ে কাজ করেন

 —————————————————————————————————————

বক্সওয়াহা (Buxwaha) ভারতের মধ্যপ্রদেশ রাজ্যের ছাতারপুর জেলার এক তহসিল এবং নগর-পঞ্চায়েত। সম্প্রতি এখানের বক্সওয়াহা জঙ্গলে ২ লক্ষ ১৫ হাজারেরও বেশি গাছ কাটা হতে পারার আশংকা দেখা দিয়েছে, কেন? না, এক হীরের খনি তৈরির জন্য। স্থানীয় সরকার অনুমতিও দিয়ে দিয়েছে ইতিমধ্যে এই খনি তৈরির, যেখানে শুধু যে এই বিপুল সংখ্যক গাছই কাটা পড়বে তা নয়, সঙ্গে এর ফলস্বরূপ বিভিন্ন প্রাণী ও উদ্ভিদকূলের প্রজাতি বিপন্ন হয়ে পড়তে পারে। কেবল তাইই নয়, এই জঙ্গলের কাছেই রয়েছে এক গুরুত্বপূর্ণ টাইগার রিজার্ভ, আর জঙ্গলের ওপর প্রত্যক্ষভাবে নির্ভরশীল ৭০০০ জনেরও বেশি বসবাসকারী উপজাতি সম্প্রদায়। এখানেই এই জঙ্গল কাটার ঝুঁকি শেষ না হয়ে যায় না, রিপোর্ট অনুযায়ী পশ্চিম ও মধ্য ভারতের যে বিস্তীর্ণ অঞ্চল খরা-প্রবন বলে চিহ্নিত, এই বক্সওয়াহাও তার মধ্যে পড়ে। তার ওপর যুক্ত হতে চলা এই হিরে খননকার্য, যা কিনা এমনিতেই অত্যধিক মাত্রায় জল টানে।

বক্সওয়াহা জঙ্গল 2

                                      source: ‘Scroll.in’,  9th June, 2021

বিষয়টা সম্প্রতি খুব চর্চাবহুল হয়ে উঠলেও, ঘটনার আসলে সূত্রপাত ১৫-২০ বছর আগে। বক্সওয়াহা অঞ্চলের জনসখ্যা ১১৫০০ এর কিছু বেশি, যার মধ্যে একটা বড় অংশই উপজাতি ও আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষ। ২০০৪ সালে রিও-টিনটো (Rio Tinto) নামক এক অ্যাঙ্গলো-অস্ট্রেলিয়ান মাইনিং কোম্পানি সার্ভে করে আবিষ্কার করে যে, এই অঞ্চলের নিচে প্রচুর পরিমাণে হীরে মজুত থাকতে পারে (প্রায় ২৭.৫ মিলিয়ন ক্যারেট) [1]। প্রকল্পটিকে সেই সময়ে ‘বান্দার প্রজেক্ট’ নাম দেওয়া হয় [2] এবং কিছু বছরের মধ্যে রাজ্য সরকারের সঙ্গে মউ সাক্ষরও সম্পূর্ণ হয় এই ভাবে যে- রিও টিনটো হীরে বেচে যতটা মুনাফা অর্জন করতে পারবে, তার ১০% রয়্যালটি পাবে মধ্যে প্রদেশ সরকার। সে সময় ৯৭১ হেক্টরের মধ্যে ৯৫৪ হেক্টরের ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তার ফলে এখনকার থেকে প্রায় দ্বিগুণ গাছ কাটা পড়ত, সঙ্গে পার্শবর্তী ‘পান্না’ ব্যাঘ্র প্রকল্প [3] ও সংলগ্ন ‘কেন’ নদীর কুমির অভয়ারণ্যটিরও ঝুঁকির সম্ভাবনা দেখা দেয়। সমগ্র বক্সওয়াহা নেচার রিসার্ভটিই হয়তো এর ফলে বিপন্ন হয়ে পড়তো কিছু মূল্যবান কর্পোরেট হীরের বিনিময়ে; সৌভাগ্যক্রমে এরকমটা হওয়ার থেকে আমাদের দেশ বেঁচে যায় শেহলা মাসুদ, বাল্মিক থাপার-দের মতো পরিবেশকর্মীদের লড়াইয়ে ও কিছু এনজিও-র দৌলতে। ২০১৬ সালের মার্চে ‘ফরেস্ট অ্যাডভাইসারি কমিটি’ ঘোষণা করে যে- বক্সওয়াহার এই অঞ্চল ‘inviolate ক্যাটাগরি’-র মধ্যে পড়ে কেননা এটা একটা ‘rich forest area’ হিসেবে গণ্য, সঙ্গে এখানে পান্না ব্যাঘ্র প্রকল্প ও অন্য আরেকটি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য বর্তমান। এই রিপোর্টের ফলস্বরূপ সরকার হীরের ওই মাইনিং প্রকল্পটিকে বাতিল করে দেয়। রিও-টিনটো একবার শেষ চেষ্টা করেছিল তৎকালীন রাজ্যসরকারকে বোঝানোর যাতে ৯৫৪ এর পরিবর্তে কেবল ৭৬.৪৩ হেক্টরে তারা খননকার্য্য চালাতে পারে [4], যেখানে হীরের প্রাচুর্য্য সর্বাধিক, যদিও সেই চেষ্টাও বিফলে যায় ফরেস্ট অ্যাডভাইসারি কমিটি অননুমোদন না করায় । শেষমেশ অগস্ট মাসে রিও-টিনটো আশা ছেড়ে দিয়ে প্রকল্প গুটিয়ে ফেলে ও ২০১৭ এর শুরুর দিকে তাদের স্থানীয় কিছু পড়ে থাকা পরিকাঠামো সরকারকে হস্তান্তর করে দিয়ে বিদায় নেয়।সে যাত্রায় আমাদের অরণ্য, বৃক্ষরাশি, নদী-নালা, বন্যপ্রাণ, উপজাতি রক্ষা পেয়ে যায় কর্পোরেটের কালো থাবার থেকে।

কিন্তু ২০১৮ সালের রাজ্যমন্ত্রকে পালাবদলের পর নতুন সরকার আবার ওই পুরোনো বাতিল প্রকল্পটিকে পুনরুজ্জীবিত করার পরিকল্পনা নেয় [5]। রিপোর্ট অনুযায়ী ২৫ বিলিয়ন ভারতীয় মুদ্রার এই প্রজেক্ট থেকে ৫৫০ বিলিয়ন আয়ের সুযোগ রয়েছে। সরকারের নিলাম-দরপত্র হাঁকের পর বাকি অংশ নেওয়া প্রতিযোগীদের পেছনে ফেলে আদিত্য বিড়লা গ্রুপ তা জিতে নেয় ও ৫০ বছরের লিজে ৩৬৪ হেক্টরের জমি তাদের দিয়ে দেওয়া হয় মাইনিং খননকার্য্যের জন্য। তবে এই চুক্তির শর্ত ছিল আগের বারের চেয়ে আলাদা, আদিত্য বিড়লা গ্রুপ নিয়ে যাবে মোট মুনাফার ৫৮% আর বাকি ৪২% পাবে রাজ্য সরকার।

কোনো দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ যেমন- অরণ্য, নদ-নদী, পাহাড়ের ওপর অধিকার থাকার কথা দেশের প্রত্যেক নাগরিকের। কিন্তু মধ্যে প্রদেশ সরকার ঠিক করছে এক স্থানীয় গুরুত্বপূর্ণ জঙ্গলকে কোনো এক বেসরকারি কোম্পানির কাছে বেচে দিয়ে তার মুনাফা সেই কোম্পানি ও সরকার নিজেদের মধ্যে ভাগ-বাঁটোয়ারা করে নেবে, আর সাধারণ মানুষ তা থেকে কি পাবে? হ্যাঁ, স্বপক্ষে বলার জন্য থাকতে পারে- চিন্তার কোনো কারণ নেই, কেননা যে পরিমান গাছ কাটা হবে এই প্রজেক্টের কাজে, তার থেকে বেশি পরিমানে বৃক্ষরোপণ করে দেওয়া হবে, সঙ্গে স্থানীয়দের জন্য যথেষ্ট কর্মসংস্থানের সুযোগ থাকবে। কিন্তু সত্যিই কি ওখানকার অরণ্য-নির্ভর আদিবাসী, উপজাতির মানুষেরা সব কিছু ছেড়ে দিয়ে ওই শস্তা ও ঝুঁকিপূর্ণ খনি-শ্রমিকদের কাজে আগ্রহী?

আর সামগ্রিকভাবে এই প্রকল্পের আউটপুটই বা কি হতে চলেছে? বানানো উচ্চমূল্যের হীরে থেকে আমাদের দেশের ক’জনের সুবিধা হবে আদতে? হীরে যার কিনা intrinsic value (অন্তর্নিহিত মূল্য) তেমন কিছুই নেই, বরং এর মান/মূল্য তৈরি করা হয়েছে কর্পোরেট দ্বারা; সেই আলংকারিক বিলাসবহুল দ্রব্য মুষ্টিমেয় কিছু ধনী মানুষদের কাছেই কুক্ষিগত থাকতে পারবে। এই শতাব্দীর শুরুর দিকে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ বলিভিয়ার জলসংকট ও সেই নিয়ে ‘কুচাপাম্পা ওয়াটার ওয়ার’ [6]-এর কথা হয়তো আমাদের অনেকেরই জানা। মধ্যপ্রদেশের বুন্দেলখন্ড হল এক বেশ খরা-প্রবণ অঞ্চল, এর ওপরে ওখানে হীরের খননকার্য্যের মতো প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে স্থানীয় মানুষদেরই জলসঙ্কট ডেকে আনা। অনুমেয় রিপোর্ট অনুসারে এই প্রকল্প দিনের আলো দেখলে প্রতি বছর প্রায় ৫.৯ মিলিয়ন কিউবিক লিটার [7] জল দরকার হবে (১ কিউবিক লিটার = ১০০০ লিটার)!

                              source: ‘Downtoearth’, thursday, 26th Oct, 2017

কিন্তু এর বিকল্প উপায়ও কোনো কোনো দেশ ইতিমধ্যেই দেখতে শুরু করেছে, ল্যাবরেটরিতে হীরে তৈরী করে! হ্যাঁ ঠিক পড়ছেন, এর জন্য জঙ্গল সাফ করে মাইনিং করার দরকার নাও পড়তে পারে, পরীক্ষাগারেই একই গুণমানের হীরে তৈরী করা সম্ভব। অনেক কোম্পানীই তাদের নিজস্ব মুনাফার জন্য ল্যাবে তৈরি হীরের গুণমান নিয়ে প্রশ্ন তোলে, সেগুলোকে নকল বলে থাকে। বাজারে ল্যাব-নির্মিত হীরের তাই যৎসামান্য বা প্রায় কোনও পুনর্নবীকরণের মূল্যই নেই। হীরে সম্ভবত কার্বনের সবচেয়ে পরিচিত অ্যালোট্রোপ (বহুরূপ), এমনকি পরীক্ষাগারে হীরে বানানো সস্তাও হয় মাইনিং থেকে বানানো একই গুণমানের হীরের থেকে। Pandora-র মতন বিশ্বের কয়েকটি বৃহৎ হীরে নির্মাতা সংস্থা প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে যে তারা এবার থেকে হীরে মাইনিং এর থেকে ল্যাব-নির্মিত হীরেকেই অগ্রাধিকার দেবে [8]। সম্প্রতি এক গবেষণামূলক রিপোর্টে উঠে এসেছে যে- আধুনিক অ্যালকেমিস্টরা বাতাস থেকে ক্ষতিকর কার্বনডাই -অক্সাইডকে ক্যাপচার করে তা থেকে হীরে বানানো সম্ভব। প্রতিটি ক্যারেট পরিবেশ থেকে 20 টন গ্রিনহাউস গ্যাস সরিয়ে দিতে সক্ষম [9]।

তো আমাদের দেশেও যদি এই পরিবর্ত জিনিষ আমরা ফলপ্রসু করতে পারি তাহলে পরিবেশ রক্ষা এবং তার পাশাপাশি প্রাণী-উদ্ভিদকূল ও সর্বোপরি মানবজাতিরই কল্যাণ হতে পারে। এই ব্যাপারে রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকার সদর্থকভাবে একসাথে কর্পোরেট সংস্থাগুলোর সাথে পর্যালোচনা করে এক সমাধানসূত্র বের করতে পারবে বলেই আশা করা যায়।

Sources:

[1]https://economictimes.indiatimes.com/industry/indl-goods/svs/metals-mining/rio-tinto-may-get-licence-to-mine-diamonds-in-madhya-pradesh/articleshow/10307739.cms?from=mdr

[2] https://www.diamondworld.net/contentview.aspx?item=5445

[3] https://www.pannatigerreserve.in/

[4]https://www.livemint.com/Politics/CBclGIQAJCJyVNoLD7uJzH/Tigers-hold-up-Rio-Tintos-diamond-mining-plans-in-Madhya-Pr.html

[5]https://www.outlookindia.com/newsscroll/diamond-mines-up-for-auction-again-in-mp/1664414

[6]https://en.wikipedia.org/wiki/Cochabamba_Water_War#:~:text=The%20Cochabamba%20Water%20War%20was,municipal%20water%20supply%20company%20SEMAPA.

[7]https://scroll.in/article/996817/in-madhya-pradeshs-buxwaha-forest-a-diamond-mine-could-claim-two-lakh-trees#:~:text=According%20to%20the%20pre%2Dfeasibility,million%20cubic%20meters%20per%20day.

[8] https://www.bbc.com/news/business-56972562

[9]https://www.scientificamerican.com/article/modern-alchemists-turn-airborne-co2-into-diamonds/

Leave a Comment