বন্ধুদের লেখা

অক্সিজেন, অ্যামাজন এবং সমুদ্রের অনুজীবেরা

অক্সিজেন, অ্যামাজন এবং সমুদ্রের অনুজীবেরা

 

কলমেঃ ডক্টর প্রিয়াঙ্কা ভৌমিক

লেখক পরিচিতিঃ

ডক্টর প্রিয়াঙ্কা ভৌমিকলেখক পরিচিতি – ডক্টর প্রিয়াঙ্কা ভৌমিক বর্তমানে টেকনো ইন্ডিয়া ইউনিভার্সিটিতে সহযোগী অধ্যাপক। মাইক্রো বায়োলজী নিয়ে গবেষণার পাশাপাশি প্রিয়াঙ্কা পাহাড়ে ঘুরতে এবং ছবি তুলতে পছন্দ করেন।

 

—————————————————————————————————————–

পৃথিবীতে প্রাণের শুরুটা হয়েছিল অকস্মাৎ।প্রায় ৪০০ কোটি বছর আগে ঘটে যায় এক আশ্চর্য ঘটনা। কিছু জৈব রাসায়নিক পদার্থ থেকে তৈরি হয় প্রথম কোষ। সেই কোষ থেকে তৈরি হয় প্রথম প্রাণ, আণুবীক্ষণিক ব্যাক্টেরিয়া। সেই থেকে শুরু  পৃথিবীতে প্রাণের জয়যাত্রা। সেই সময়ের পৃথিবী কিন্তু এখনকার থেকে অনেক আলাদা ছিল। বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেন ছিলই না। তার বদলে হাইড্রোজেন, কার্বন ডাই অক্সাইড, মিথেন আর নাইট্রোজেন এ ভরা ছিল বাতাস। আর সেই পরিস্থিতিতেই তৈরি হচ্ছিল নতুন নতুন প্রাণ।  কিন্তু প্রায় ২০০ কোটি বছর আগে পৃথিবী তে ঘটে যায় এক অঘটন। ব্যাক্টেরিয়া দের পরিবারের এক সদস্য সায়ানোব্যাক্টেরিয়া খুঁজে পায় এক অনন্ত শক্তির খনি, সূর্যালোক। তাকে কাজে লাগিয়ে তৈরি করতে থাকে নিজেদের খাবার।ঘটে যায় এক  মিরাকল যাকে আমরা সালোকসংশ্লেষ বলে জানি।  আর সেখান থেকে পৃথিবীতে প্রাণের ইতিহাস এক অন্য খাতে বইতে শুরু করে। সালোক সংশ্লেষ এর ফলে তৈরি হয় অক্সিজেন।বায়ুমণ্ডলে বাড়তে থাকে অক্সিজেনের মাত্রা।

কিন্তু সেইসময় এর প্রাণীদের জন্য  অক্সিজেন ছিল বিষাক্ত। বায়ুমণ্ডলে ক্রমবর্ধমান অক্সিজেন ধীরে ধীরে মেরে ফেলতে থাকে সেইসময়ে র অধিকাংশ প্রাণ। যারা বেঁচে থাকলো তারা শিখে গেলো অক্সিজেন কে ব্যাবহার করতে। আর ক্রমে ক্রমে অক্সিজেন হয়ে উঠলো আবশ্যিক। বর্তমান পৃথিবীতে প্রায় প্রতিটি প্রাণ বেঁচে থাকার শক্তি তৈরি করার জন্য নির্ভর করে অক্সিজেন এর উপর। আর তাই ২০২০ সালের আমাজন জঙ্গলের ভয়াবহ দাবানল শঙ্কিত করে তুলেছিল বিশ্বব্যাপী পরিবেশ সচেতন মানুষকে। আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম থেকে শুরু করে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা এগিয়ে এসে দাবি তুলেছিলেন আমাজন জঙ্গলকে রক্ষা  করার।

যেহেতু গাছ বাতাস থেকে কার্বনডাই অক্সাইড টেনে নিয়ে অক্সিজেন কে ফিরিয়ে দেয়, তাঁদের আশঙ্কা ছিল যে এই বিস্তীর্ণ আমাজন জঙ্গলের অসংখ্য গাছের আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়া ব্যাহত করবে বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেনের যোগান, তৈরি করবে অক্সিজেনের স্বল্পতা। আশঙ্কা ছিল পৃথিবীর ফুসফুস নামে পরিচিত আমাজনের জঙ্গল এর ক্ষতিতে দেখা দিতে পারে অক্সিজেনের অভাব। কিন্তু প্রশ্ন হলো এই আশঙ্কা কতটা বিজ্ঞানসম্মত এবং উত্তর হলো এই আশঙ্কার পিছনে সত্যি কোনো যুক্তিপূর্ণ  কারণ নেই। সত্যিটা হল এই যে অক্সিজেন আমরা গ্রহণ করি তাতে আমাজন জঙ্গলের কোনো অবদান নেই। কথাটা অনেক টাই অবিশ্বাস্য, আর তাই কারণ টা বুঝতে হলে আমাদের আগে বুঝতে হবে একটি বাস্তুতন্ত্র কিভাবে কাজ করে।

পৃথিবীকে যদি আমরা ঠিক দুভাগে ভাগ করি, অর্থাৎ নিরক্ষরেখা ববাবর, আমরা দেখতে পাবো প্রতিটি মহাদেশেই নিরক্ষরেখা র আশেপাশে ঘন জঙ্গল রয়েছে,যা নিরক্ষীয় বনাঞ্চল নামে পরিচিত। এই নিরক্ষীয় বনে সালোক সংশ্লেষ এর মাত্রা পৃথিবীর অন্য প্রান্তের বনের থেকে অনেক বেশি। বিশেষ করে আমাজন জঙ্গল তার সুবিশাল আকারের কারণে এই প্রসঙ্গে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তা সত্বেও বৈজ্ঞানিক গণনা বলছে গোটা পৃথিবীর সালোক সংশ্লেষ এবং অক্সিজেন এর মাত্র ৯ শতাংশ আসে আমাজন এর জঙ্গল থেকে। অবশ্য ৯ শতাংশ গাণিতিক হিসেবে কম হলেও বাস্তুতন্ত্রের দিক থেকে যথেষ্ট গুরুত্তপূর্ণ। কিন্তু আমাদের আরো একটি বৈজ্ঞানিক তথ্য মাথায় রাখতে হবে। সালোক সংশ্লেষ কারী জীবেরা কিন্তু পৃথিবীর অন্য জীব দের মতোই শ্বাস প্রশ্বাস নেয় এবং ঠিক অন্য জীবদের মতোই সেইসময় অক্সিজেন নিয়ে কার্বনডাই অক্সাইড কে ত্যাগ করে। বৈজ্ঞানিক গবেষণা বলছে যে ৯ শতাংশ অক্সিজেন আমাজন এর বন তৈরি করে তার অনেক টাই চলে যায় তার নিজের শ্বাস প্রশ্বাস এর পেছনে। আর বাকিটা অক্সিজেন ব্যাবহার করে আমাজন জঙ্গলে থাকা অগণিত আণুবীক্ষণিক জীব যারা এই অক্সিজেন কে কাজে লাগিয়ে মৃত গাছদের পাতা কাণ্ড ইত্যাদির পচন ঘটায়। আর এইভাবে চক্রাকারে চলতে থাকে পৃথিবীতে প্রাণের নিরবিচ্ছন্ন চক্র।

তাহলে প্রশ্ন হল বায়ু মণ্ডলে থাকা অক্সিজেন এলো কোথা থেকে। তার উত্তর দিতে পারে সমুদ্র, নদীর জলে থাকা অসংখ্য অণুজীব রা, যারা কোটি বছর ধরে সালোক সংশ্লেষ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ধীরে ধীরে বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেন এর মাত্রা বাড়িয়েছে। যাদের দৌলতে মানুষ বেঁচে থেকে  গর্ব করে শ্রেষ্ঠতম প্রাণী হবার। তাহলে এর মানে কি বন সংরক্ষণ এর কোনো প্রয়োজনীয়তা নেই? উত্তর হল বন সংরক্ষণ ছাড়া পৃথিবীতে প্রাণের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার আর দ্বিতীয় কোনো উপায় নেই। এই বিশ্বের সমস্ত প্রাণ নির্ভর করে আছে বাস্তুতন্ত্র গুলির পারস্পরিক সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম আদানপ্রদানের উপর। আর এই ভারসাম্য রক্ষায় অন্যতম ভূমিকা রয়েছে আমাজন জঙ্গলের মতো সুবিশাল বাস্তুতন্ত্র গুলির। আমাজন নদীর অববাহিকার এই ঘন বন অসংখ্য প্রজাতির বাসস্থান।পৃথিবীতে বসবাসকারী প্রতি ১০ টি প্রজাতির মধ্যে একটি প্রজাতি বাস করে আমাজন বনে।

তাছাড়া প্রায় ৩ কোটি মানুষ বাস করেন এই জঙ্গল এবং তার সংলগ্ন অঞ্চলে। তার মধ্যে রয়েছেন প্রায় ৩৫০ টি আদিম আদিবাসী সম্প্রদায়। এই বিশাল সংখ্যক মানুষের বেঁচে থাকার জন্য কৃষিকাজ, পশুপালন ইত্যাদি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে নির্ভর করে আমাজনের জঙ্গলের উপর। অন্যদিকে আমাজন বনে থাকা গাছেরা আমাজন নদীর জলীয় বাষ্প কে ধরে রেখে বৃষ্টিপাত ঘটায়। প্রকৃতপক্ষে গোটা দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশের বার্ষিক বৃষ্টিপাত নির্ভর করে থাকে এই বন টির উপর।এবং আমরা সকলেই জানি কিভাবে চাষাবাদ নির্ভর করে বাৎসরিক বৃষ্টিপাতে র উপর। কিন্তু এই জঙ্গলের সবচেয়ে গুরুত্ব পূর্ণ কাজ হলো বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাঅক্সাইড এর মাত্রা সংকোচন করা। আমাদের বুঝতে হবে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে থাকা অক্সিজেন শেষ হয়ে যাওয়া আমাদের সমস্যা নয়। কারণ বাতাসের কুড়ি শতাংশের কিছু বেশি হলো অক্সিজেন যার মাত্রা যা মানুষের তৈরি করা অজস্র দূষণের মধ্যেও দীর্ঘকাল ধরে প্রায় একই রয়েছে।

কিন্তু মানুষের দূষণের কারণে বাতাসে কার্বন ডাইঅক্সাইড এর মাত্রা কিন্তু বেড়েই চলেছে। ২০২০ সালে বাতাসে কার্বনডাই অক্সাইড এর পরিমাণ বিগত চল্লিশ লাখ বছরের মধ্যে ছিল সর্বোচ্চ। আর ক্রমর্ধমান কার্বন ডাইঅক্সাইড পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বাড়িয়ে গলিয়ে ফেলছে উত্তর আর দক্ষিণ মেরুর বরফ, গোটা বিশ্বের তাপমাত্রা , বৃষ্টিপাত সবকিছুর ভারসাম্য নড়ে গিয়ে অজস্র প্রজাতি প্রতিদিন হয়ে  চলেছে বিপন্ন, বিলুপ্ত। যেকোনো জঙ্গল বিশেষ করে নিরক্ষীয় বনাঞ্চল বাতাসের কার্বনডাই অক্সাইড কে নিজের শরীরে আত্তীকরণ করে সালোক সংশ্লেষ প্রক্রিয়া র মাধ্যমে।তার প্রত্যক্ষ ফল হলো বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাইঅক্সাইড এর মাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকা।

উদাহরন হিসেবে বলা যেতে পারে আমাজন বনের একটি ছোট অংশ বছরে প্রায় কুড়ি লাখ গাড়ির কার্বন নিঃসরণের সমান কার্বন কে  আত্তীকরণ করতে পারে। তাই বাতাসে কার্বন ডাই অক্সাইডের মাত্রা কমাতে আমাজন তথা অন্যান্য বনাঞ্চলের বিকল্প কিছু নেই। সুতরাং আমাজনে র জঙ্গলে র আগুন আমাদের সবার সমস্যা, দেশের গণ্ডি পেরিয়ে। আবহমান কাল ধরে বয়ে চলা এই প্রাণের ধারা বহু বছর ধরে তিলতিল করে গড়ে তুলেছে  এক বাস্তুতন্ত্র, তার অসংখ্য প্রাণী,গাছপালা আর অণুজীব দের নিয়ে। আজ যদি সভ্য হবার গর্বে মানুষ তা ধ্যংস  করে সেটাই হবে মানব সভ্যতার কফিনে শেষ পেরেক।

Leave a Comment