টুকিটাকি

বাড়ি ভেসে যাওয়ার আগে বিয়ে করে নাও

বাড়ি ভেসে যাওয়ার আগে বিয়ে করে নাও

প্রতিদিন জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে তথ্যের কচকচানি দিতে দিতে আজকে মনে হল একটা গল্প বলি। গল্পটা বাংলাদেশের একটি মেয়েকে নিয়ে। তার নাম হাসি মল্লিক বা হাসিনা যা খুশি হতে পারে। বাড়ির পাশেই নদী আর একটু দূরেই সমুদ্র। মেয়েটির বড় হয়ে ওঠা নিস্তরঙ্গ জীবনের মতো চলছিল। স্কুল পড়াশোনা মা বাবার চোখের মনি সবকিছুই ঠিকঠাক যাচ্ছিল। একটু উঁচু ক্লাসে ওঠার পর থেকে তার গ্রামে মাঝেমধ্যেই বন্যা হত। দু একবার সাইক্লোনের ধাক্কায় বাড়িও ভেঙেছে। সাইক্লোন আসার খবর পেলেই ছুটে যেতে হত দূরের সাইক্লোন সেন্টার টায়। সেখানে গুঁতোগুঁতি করে কয়েকদিন থেকে চিড়ে আর গুড় খেয়ে ভাঙ্গা বাড়িতে আবার ফিরে আসা। এমন করেই চলছিল কিন্তু বারো বছর পেরোতে না পেরোতেই তার বিয়ে ঠিক হয়ে গেল। সাধ্যমত বা বলা ভাল সাধ্যের থেকে অনেকটা বেশি খরচ করে অনেক টাকা পণ দিয়ে বাবা পাঠালো শ্বশুরবাড়ি। প্রতিবাদ করার চেষ্টা করেছিল সে, স্কুলে জানিয়েছিল। কিন্তু বাবার চোখের জলে সামনে সব ভেসে গেল। বাবা বলেছিল মা তোকে আমি রাখবো কোথায় খেতে কি দেবো? জমি বাড়ি সবই তো গেছে নদীর পেটে। আর যেটুকু আছে সেখানে নুন।

আরেকজন পূজা বা বিউটির জন্ম রাজধানীর এক বস্তিতে। ছোট থেকে শুনে এসেছে তার বাড়ির গোলাভরা ধান আর পুকুর ভরা মাছ এর কথা কিন্তু কখনো চোখে দেখেনি। বছর পাঁচেক আগে সাইক্লোনের ধাক্কায় সব হারিয়ে কোন রকমে পরিবার নিয়ে পালিয়ে আসা রাজধানীতে। তাও সাধের গরু কালিকে আনতে পারেনি সাথে। ভেসে গিয়েছিল সে। রাজধানীতে এসে একে ওকে ধরে কোনরকমে মাথা গোঁজার ঠাঁই এই ১০/১৫ ফুটের ঘরটা। বাবা-মা-ভাই-বোন মিলিয়ে ৬ জন গুঁতোগুঁতি করে কোনরকমে থাকা। বস্তিতে একজন নেতা গোছের লোক আছে যে মাঝেমধ্যেই বাবার কাছে আসে আর বলে বিউটির সাথে বিয়ে না দিলে সোজা উচ্ছেদ করে দেবে। লোকটিকে কিছুতেই আটকানো যাচ্ছে না এবং লোকটির যথেষ্ট প্রভাব থাকায় অন্য কোনভাবে সামলানো যাচ্ছে না রেখে বিউটির বাবা বাধ্য হয়ে বিউটির বিয়ে ঠিক করে। লোকটির আগে একটি বিয়ে ছিল এবং বিউটিকে বিয়ে করার দু’বছরের মধ্যে লোকটি বিউটিকে বের করে দেয় বাড়ি থেকে। বিউটি এখন তার দেড় বছরের বাচ্চাকে নিয়ে রাজধানীতে কাজের লোক।

বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান বলছে বাংলাদেশের উপকূলবর্তী পরিবার গুলির মধ্যে যারা দীর্ঘদিন ধরে বন্যা পরিস্থিতিতে থাকেন এবং যাদের পুকুর এবং জমিতে নোনা জল ঢুকেছে সাইক্লোন বা বন্যার ফলে , তাদের মধ্যে অনেক পরিবারই মেয়ের বিয়ে ছোটবেলাতেই দিয়ে দেন। অর্থাৎ শিশু বিবাহের ঘটনা দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় জলবায়ু বিপন্ন অঞ্চলে বেশি। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিপন্ন পরিবারগুলি বাধ্য হয়ে মেয়ের বিয়ে দিয়ে দেন। দেখা গেছে অনেক পরিবারই বেশি করে পণ দিয়ে, ঋণের বোঝা চাপিয়ে, মেয়ের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে চায়। শুধুমাত্র বাংলাদেশে নয় জলবায়ু পরিবর্তন যে বাল্যবিবাহকে প্রভাবিত করে সেটা গোটা পৃথিবীর জলবায়ু বিপন্ন দেশগুলিতে দেখা গেছে। একইভাবে জলবায়ু রিফিউজি বা জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কায় উদ্বাস্তু মানুষেরা, যখন শহরে সস্তা শ্রমিকের কাজ করেন, তাদের পরিবারে ও বাল্য বিবাহের হার অনেকটা বেশি। বাবা মায়েরা তার সন্তান যেন সুরক্ষিত থাকে এই আশায় অনেক কম বয়সেই কন্যা বিবাহ সম্পন্ন করিয়ে দেন। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে উপকূলবর্তী অঞ্চলে বন্যা, জল জমে থাকা, নোনা মাটি এবং নোনা জলের আধিপত্য যত বাড়ছে ততই বাল্যবিবাহকে একটা কপিং স্ট্রাটেজি বা টিকে থাকার উপায় হিসাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। একই সাথে বাড়ছে অপুষ্টি এবং শিশু পাচারের মত ঘটনা। কমছে শিক্ষার হার। তাই উপায় হিসেবে বিয়ে কে বেছে নিতে হচ্ছে বাধ্য হয়ে।

 

প্রচ্ছদের ছবি : qz.com

Leave a Comment